অন্যান্য প্রাণীর মাসিক ঋতুচক্র: চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
মানুষের মত অন্যান্য প্রাণীদেরও প্রজনন ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে মাসিক (Menstruation) বা ঋতুস্রাব একরকম ঘটে না। চিকিৎসাশাস্ত্র ও প্রাণীবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় যে কিছু নির্দিষ্ট স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে মানুষের মত ঋতুস্রাব হয়, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে এটি ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। এই নিবন্ধে, আমরা জানবো কোন কোন প্রাণীর মাসিক ঋতুস্রাব হয়, কেন এবং কীভাবে এটি মানুষের তুলনায় আলাদা।
১. ঋতুচক্র ও মাসিক ঋতুস্রাবের সংজ্ঞা
মাসিক ঋতুস্রাব হল এক ধরনের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা স্ত্রীলিঙ্গের কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে ঘটে। এটি মূলত একটি প্রজনন চক্রের অংশ যেখানে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণ (endometrium) প্রতি মাসে প্রস্তুত হয় গর্ভধারণের জন্য, কিন্তু গর্ভধারণ না হলে এটি রক্ত এবং টিস্যুর আকারে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
এটি ঘটে হরমোনের নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে এস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং প্রজেস্টেরন (Progesterone) হরমোনের ওঠানামার কারণে।
২. কোন প্রাণীদের মাসিক ঋতুস্রাব হয়?
মানুষ ছাড়াও কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে মাসিক ঋতুস্রাব পরিলক্ষিত হয়। এই প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে:
ক. মহাযষ্টি (Great Apes) বা বৃহৎ বানর জাতীয় প্রাণী
- শিম্পাঞ্জি (Chimpanzees)
- ওরাংওটাং (Orangutans)
- বনোবো (Bonobos)
- গরিলা (Gorillas)
এরা মানুষের মতো নিয়মিত ঋতুস্রাবের মধ্য দিয়ে যায়, যদিও তাদের ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
খ. বাদুড়ের কিছু প্রজাতি (Certain Bat Species)
- স্পেকটাকলড ফ্রুট ব্যাট (Spectacled Flying Fox)
- কুবানো বাড ফ্রুট ব্যাট (Cuban Greater Funnel-Eared Bat)
বাদুড়ের কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যেও ঋতুস্রাব দেখা যায়। এদের ঋতুচক্রের ধরন মানুষের মতো হলেও কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির।
গ. হাতির কিছু প্রজাতি (Certain Elephant Species)
- এশিয়ান হাতি (Asian Elephant)
হাতির মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট ধরণের ঋতুচক্র দেখা যায়, যা প্রজননক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে ঋতুচক্র কেমন?
যেসব প্রাণীর ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব নেই, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত এস্ট্রাস চক্র (Estrous Cycle) বিদ্যমান। এই চক্রে জরায়ুর আস্তরণ (endometrium) পূর্ণ মাত্রায় তৈরি হয় না, তাই মাসিকের মাধ্যমে এটি বেরিয়ে আসার দরকার হয় না। পরিবর্তে, গর্ভধারণ না হলে এটি শরীরের ভেতরেই পুনঃশোষিত হয়ে যায়।
এস্ট্রাস চক্র কাদের হয়?
বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এস্ট্রাস চক্র দেখা যায়, যার মধ্যে রয়েছে:
- বিড়াল (Cats)
- কুকুর (Dogs)
- গরু (Cows)
- ঘোড়া (Horses)
- বাঘ ও সিংহ (Tigers & Lions)
- খরগোশ (Rabbits)
এসব প্রাণীদের ক্ষেত্রে গরমকালীন সময় বা প্রজনন ঋতুতে বিশেষ আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়, যা তাদের সন্তান ধারণের উপযুক্ত সময় নির্দেশ করে।
৪. মানুষের ঋতুস্রাব বনাম অন্যান্য প্রাণীর চক্র
| বৈশিষ্ট্য | মানুষের ঋতুচক্র | এস্ট্রাস চক্রবিশিষ্ট প্রাণীদের ঋতুচক্র |
|---|---|---|
| অবস্থা | রক্তক্ষরণের মাধ্যমে জরায়ুর আস্তরণ বের হয় | জরায়ুর আস্তরণ পুনঃশোষিত হয় বা খুব সামান্য রক্তপাত হয় |
| চক্রের ধরণ | নিয়মিত মাসিক (Menstruation) | নির্দিষ্ট প্রজনন ঋতুতে এস্ট্রাস চক্র সক্রিয় |
| গর্ভধারণের সম্ভাবনা | চক্রের নির্দিষ্ট সময়ে গর্ভধারণ সম্ভব | শুধুমাত্র এস্ট্রাস সময়ে গর্ভধারণ সম্ভব |
| উদাহরণ | মানুষ, বৃহৎ বানর, বাদুড়ের কিছু প্রজাতি | কুকুর, বিড়াল, গরু, ঘোড়া, বাঘ, সিংহ |
৫. কেন কিছু প্রাণীর ঋতুস্রাব হয়, আর কিছু প্রাণীর হয় না?
ক. বিবর্তনগত কারণ (Evolutionary Reason)
বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, কিছু নির্দিষ্ট প্রাণীর ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের মাধ্যমে জরায়ুর আস্তরণ শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটি উন্নত কৌশল, যা গর্ভধারণের জন্য জরায়ুকে পরিষ্কার করে। অন্যদিকে, অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীর এই আস্তরণ পুনঃশোষণ করে শক্তি সংরক্ষণ করে।
খ. প্রজনন পদ্ধতির পার্থক্য (Reproductive Strategy)
যেসব প্রাণী নিয়মিতভাবে সন্তান জন্ম দেয়, যেমন গরু বা কুকুর, তাদের শরীর বেশি কার্যকরভাবে জরায়ুর আস্তরণ ব্যবস্থাপনা করতে পারে। কিন্তু মানুষ এবং বৃহৎ বানরদের মতো প্রাণীদের গর্ভধারণের হার তুলনামূলক কম, তাই তাদের শরীরে অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়, যার ফলে ঋতুস্রাব ঘটে।
গ. জরায়ুর গঠন (Uterine Structure)
মানুষ এবং মহাযষ্টির জরায়ুর গঠন এমনভাবে তৈরি যে এটি প্রতিবার নতুন করে একটি সম্পূর্ণ প্রজনন পরিবেশ তৈরি করে, যা অপ্রয়োজনীয় হলে নিষ্কাশন করে ফেলা হয়। অন্যদিকে, গরু বা কুকুরের শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি এটি শোষণ করে ফেলে।
৬. চিকিৎসা ও বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞানীদের মতে, মাসিক ঋতুস্রাবের কারণ মূলত হরমোনজনিত। এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরনের মাত্রা ওঠানামার ফলে জরায়ুর আস্তরণ তৈরি ও পতন ঘটে।
ক. গবেষণালব্ধ তথ্য
- ২০১১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয় যে, শুধুমাত্র মানুষের মত আর কিছু নির্দিষ্ট প্রাণী নিয়মিতভাবে ঋতুস্রাবের মধ্য দিয়ে যায়।
- ২০১৯ সালে বাদুড়ের কিছু প্রজাতির ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, তারা মানুষের মত ঋতুস্রাব করে।
- গরু, কুকুর, বিড়াল, বাঘ, সিংহের ক্ষেত্রে হালকা রক্তপাত হতে পারে, কিন্তু তা ঋতুস্রাবের মতো নয়।
খ. চিকিৎসাবিদ্যার গুরুত্ব
- কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা হরমোনের পরিবর্তন সংক্রান্ত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
- গৃহপালিত প্রাণীদের (যেমন কুকুর, বিড়াল) ক্ষেত্রে এই চক্র সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা পশুচিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
৭. উপসংহার
মানুষের মতো অন্যান্য কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীরও ঋতুস্রাব হয়, কিন্তু অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি ভিন্নভাবে ঘটে। এদের মধ্যে বড় বানর, বাদুড়ের কিছু প্রজাতি এবং হাতি উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণী এস্ট্রাস চক্র অনুসরণ করে, যা তাদের প্রজনন পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই পার্থক্যগুলো মূলত বিবর্তন, শরীরের গঠন ও প্রজনন কৌশলের কারণে হয়েছে, যা চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন